ইতিহাসে অম্লান পল্লীবন্ধু এরশাদ

গোলাম মোহাম্মদ কাদের । (প্রকাশিত ,১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ যুগান্তর)

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রপতি, আমাদের নেতা, পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গত ১৪ জুলাই ইন্তেকাল করেছেন। যখন তিনি ইন্তেকাল করেন তখন ছিলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা; যে সংসদে সংসদ নেতা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

১৯৯১ সালের পর থেকে আমৃত্যু অর্থাৎ প্রায় ২৭ বছরের কিছু বেশি সময় তিনি সরকারের বাইরে ছিলেন ও সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে, বেশিরভাগ সময় বিরোধীদলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে তুলনায় তিনি ক্ষমতায় ছিলেন ৯ বছরের কিছু কম সময়।

এক কথায় তার রাজনৈতিক জীবনের ৪ ভাগের ৩ ভাগ তিনি ক্ষমতার বাইরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ সময়কালে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড গণতন্ত্র রক্ষা ও বিকাশের জন্য নিবেদিত ছিল।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তিনি দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। তৎকালীন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তার এ ক্ষমতা গ্রহণকে সে সময়কার বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের প্রায় সবাই হয় সরাসরি সমর্থন করেছেন অথবা সংকট উত্তরণের অন্য কোনো উপায় ছিল না মন্তব্য করে পরোক্ষভাবে সমর্থন জানিয়েছেন, এটাই বাস্তবতা।

অভ্যুত্থান অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় যখন তা ব্যর্থ হয়। কিন্তু অভ্যুত্থান সফল হলে তাকে আইনানুগ ধরা হয় ও সফল অভ্যুত্থান অনেক নতুন আইনের উৎস হয়, ইতিহাস এর সাক্ষী। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দায়িত্বগ্রহণ একটি সফল অভ্যুত্থানের ফসল।

১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টি গঠন করেন। এ সালের প্রথম দিকে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে।

সে সংসদে বিরোধী দল ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। একই সালে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় ও পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন।

১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর তৃতীয় জাতীয় সংসদে ৭ম সংশোধনী গৃহীত হয় ও সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়। একইসঙ্গে সংবিধান পুনর্বহাল করে সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। পল্লীবন্ধু এরশাদ ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯০ সালে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তার পুরো শাসনামলকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়- প্রথম ভাগ, সামরিক শাসনের অধীনে দেশ পরিচালনা।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক শাসন জারি করা হয় এবং তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বগ্রহণ করেন। ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর, যেদিন তৃতীয় সংসদে সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক আইন তুলে নেয়া হয় ও সংবিধান পুনর্বহাল করা হয়। এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সময়কাল।

দ্বিতীয় ভাগ, সংবিধান পুনর্বহাল করে তার আওতায় দেশ পরিচালনা। ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর-পরবর্তী সময় থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত; যখন তিনি সাংবিধানিকভাবে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে উপরাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে তার কাছে পদত্যাগপত্র পেশ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

পরবর্তী সময়ে মহামান্য আদালত কর্তৃক ৭ম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করা হয়। কিন্তু উল্লেখ্য, ওই আদেশ মোতাবেক ৭ম সংশোধনের অধীনে গৃহীত সব বিষয় বাতিল করা হয়নি।

আদালতের রায়ে দেশের কল্যাণে ও জনস্বার্থে গৃহীত কর্মকাণ্ড এবং বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিগুলোকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। ফলে তার শাসনকালের প্রথম ভাগকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে ঠিকই; তবে সেখানে গৃহীত প্রায় সব পদক্ষেপকে বৈধতা দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বরের সময়কাল সম্পর্কে উচ্চ আদালত বৈধতা বিষয়ে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করেননি। সে কারণে তার সেই আমলকে সর্বোচ্চ আদালত বৈধ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন বলা যায়।

ক্ষমতা ত্যাগের পর অর্থাৎ ১৯৯১ সালের প্রথম থেকে তার জীবদ্দশায় শুধু একটি সংসদ ছাড়া বাকি সব সংসদে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন এবং বিজয়ী হয়েছেন। সর্বোচ্চ অনুমোদিত ৫টি আসন থেকে পরপর দু’বার সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন কারাগারে অন্তরীণ থাকাবস্থায়।

পরবর্তী সময়ে যখন সর্বোচ্চ তিনটি আসন থেকে নির্বাচন করার বিধান করা হয়, সেক্ষেত্রেও তিনি তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটি আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। যখন যেখানে প্রার্থী হয়েছেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে তিনি বিজয়ী হয়েছেন।

একসময় বলা হতো পল্লীবন্ধু এরশাদ শুধু রংপুরেই বিজয়ী হতে পারেন; কিন্তু পরে এ মন্তব্য অসার প্রমাণিত হয়, যখন ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি রাজধানী ঢাকার একটি আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।

হাজার রকমের প্রতিকূলতা, বাধা-বিপত্তি তার জনসমর্থনকে ম্লান করতে পারেনি। তিনি ছিলেন জননন্দিত একজন রাজনীতিবিদ। আর তিনি যে একজন জননন্দিত নেতা ছিলেন, জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, সেটা নিশ্চিত প্রমাণিত হয় মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে তার অসুস্থতাকালীন ও তার মৃত্যুর পর।

তিনি যখন শঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন, সারা দেশের অগণিত মানুষ তার জন্য উদ্বিগ্ন সময় কাটিয়েছেন, ভালো-মন্দের খোঁজখবর নিয়েছেন। তার জন্য রক্তের প্রয়োজনে লম্বা লাইন দিয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে রক্ত দেয়ার জন্য অপেক্ষা করেছেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর ৪টি জানাজার আয়োজন করা হয়েছিল- প্রথমটি সেনানিবাস কেন্দ্রীয় মসজিদে, দ্বিতীয়টি সংসদ ভবনে, তৃতীয়টি বায়তুল মোকাররম মসজিদে এবং সর্বশেষ রংপুর ঈদগাহ ময়দানে।

প্রতিটিতে স্মরণাতীতকালের বৃহত্তম জমায়েত হয়েছিল, জানাজার স্থল লোকে লোকারণ্য ছিল। তাছাড়া ১৫ জুলাই কাকরাইলের কেন্দ্রীয় পার্টি কার্যালয়ে মরদেহ জনগণের শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশে তিন ঘণ্টার মতো রাখা ছিল।

প্রচণ্ড রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজারও মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে সারিবদ্ধভাবে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সব অঞ্চল থেকে নেতাকর্মীরা বাসে-ট্রেনে-লঞ্চে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করে তার মরদেহে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য হাজির হয়েছিলেন।

১৯ জুলাই গুলশান আজাদ মসজিদে তার কুলখানি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানেও মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ গণমানুষের ঢল নেমেছিল।

ওইসব মানুষের জন্য আমাদের তরফ থেকে জানাচ্ছি বুকভরা ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই যে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা লাভ করেছেন, এটি তিনি অর্জন করেছিলেন তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন- সেজন্য তাদের আমি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। তার মৃত্যুর পরে অনেক বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র/সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণ পত্রদ্বারা শোক জানিয়ে বার্তা প্রদান করেছেন।

তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ১. ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ২. দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন, ৩. ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল, ৪. ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং, ৫. পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাখদুম শাহ মাহমুদ কোরেশি। এছাড়াও বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রায় সব দেশের রাষ্ট্রদূত বা তাদের প্রতিনিধিরা শোক বইয়ে স্বাক্ষর প্রদান করেন। তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি দীর্ঘদিন সেনাপ্রধান ছিলেন। তাছাড়া অনেক সংস্থার প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। সে পরিপ্রেক্ষিতে দেশ, জাতি, সমাজ ও ব্যক্তিগতভাবে অগণিত সাধারণ মানুষের জীবনে পল্লীবন্ধু এরশাদের অনেক অবদান আছে।

অনেক উন্নয়নমূলক ও সংস্কার কাজ আজ চোখে পড়ে, যার সুফল মানুষ এখন ভোগ করছে বা যার কারণে দেশ গর্ববোধ করতে পারে। সেগুলোর পরিচর্যা অনেকেই হয়তো পরে করেছেন; কিন্তু মূল বীজটি রোপণ করেছিলেন পল্লীবন্ধু এরশাদ।

তিনি বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার ফলস্বরূপ সাকিব, মুশফিকসহ আরও অনেক বিশ্ববরেণ্য ক্রিকেটার তৈরি হয়েছে। ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশের অবস্থান আমাদের গর্বিত করে। বাংলাদেশ অন্যান্য অনেক খেলায়ও ভালো করছে। প্রধানত বিকেএসপির ছাত্রদের কারণে।

তিনি সারা দেশে অনেক গলফ খেলার মাঠ ও অন্যান্য সুবিধা সৃষ্টি করেছিলেন। গলফ খেলাকে জনপ্রিয় করেছিলেন। ফলে বিশ্ব অলিম্পিক বা এ গলফ খেলায় প্রতিযোগিতা করে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছিল গলফার সিদ্দিকুর রহমান।

তিনি ঢাকা শহরের মিরপুরে ইনডোর স্টেডিয়াম, ক্রিকেট স্টেডিয়াম এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আর্মি স্টেডিয়াম নির্মাণ করেন। এছাড়াও তিনি প্রত্যেক জেলায় স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তার সময়কালে অনেক জেলায় স্টেডিয়াম নির্মিত হয়। সে পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে জেলা শহরগুলোতে স্টেডিয়াম নির্মিত হয়।

তৈরি পোশাক শিল্প বিকাশে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে Back to Back L/C I Bonded ware house সুবিধা চালু করে এ শিল্পকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন।

তার যুগান্তকারী ওষুধনীতির কারণেই বাংলাদেশে ওষুধ শিল্প দ্রুত বিকশিত হয়ে বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে।

চামড়া শিল্প বিকাশের সুবিধার্থে তিনি কাঁচা চামড়া রফতানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন।

এখানে উল্লেখ্য, বর্তমানেও অর্থাৎ ত্রিশ বছরের অধিক সময় পর্যন্ত এ ব্যবস্থা চালু আছে যা অযৌক্তিক। অতিসম্প্রতি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট তৈরি করে চামড়ার মূল্য সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে যায়।

এতে করে কোরবানির সময় চামড়ার অর্থে যেসব এতিম ও দুস্থ মানুষ উপকৃত হতো তারা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কাঁচা চামড়া রফতানি করার সুযোগ দিয়ে বাজার উন্মুক্ত করলে অনেক বেশি ক্রেতা আসবে এবং চামড়ার দাম যৌক্তিক পর্যায়ে পৌঁছাবে।

রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবি এদেশের মানুষের প্রাণের দাবি ছিল দীর্ঘকাল থেকে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে অনেক দেশপ্রেমিক শহীদ হয়েছিলেন। সে কারণে ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ দিবস পালন করা হয়।

২১ ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও উদযাপিত হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছে। এসব আমাদের গর্বের ইতিহাস। কিন্তু আইন প্রণয়ন করে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সব কাজকর্মসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের ব্যবস্থা করেছিলেন পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য তিনি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের স্মৃতিবিজড়িত মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, সাভার স্মৃতিসৌধ ইত্যাদির সংস্কার ও নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন।

তিনি উপজেলা পদ্ধতির প্রচলন করেন। এটি তার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ; এর মাধ্যমে তিনি প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণ করেছিলেন। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা তৃণমূল পর্যন্ত প্রসারিত করার লক্ষ্যে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ মোতাবেক ‘প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত করেছিলেন,’ যা তার আগে অনুসরণ করা হয়নি।

বিচারব্যবস্থা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশে তিনি উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপন করেন।

একইসঙ্গে উচ্চ আদালতকেও তিনি দেশের মানুষের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার সময় দেশের ৬টি স্থানে যথা- রংপুর, বরিশাল, যশোর, কুষ্টিয়া, সিলেট ও চট্টগ্রামে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপন করা হয়েছিল।

উপজেলাকে গ্রোথ সেন্টার হিসেবে বিবেচনা করে শহরের সব সুযোগ-সুবিধা সেখানে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছিলেন; বর্তমান সরকারের গ্রাম হবে শহর এ কর্মসূচি কিছুটা সে ধরনের। উপজেলার সঙ্গে জেলা শহরের ও জেলা শহর থেকে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণসহ প্রাথমিক কার্যাদি সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। বঞ্চিত-অবহেলিত উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য সেতুটিকে বহুমুখী করে সড়কের সঙ্গে রেল যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোজনের ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে এ সেতু পরবর্তী সময়ে নির্মিত হয়ে যমুনা নদীর কারণে সৃষ্ট আঞ্চলিক বিভাজন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।

সারা দেশে অবকাঠামোগত যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আমূল উন্নয়ন তার সময় হয়েছিল।

তাছাড়া দরিদ্র মানুষের জন্য গুচ্ছগ্রাম, পথকলি ট্রাস্ট তিনি সৃষ্টি করেছিলেন; যা ভিন্ন ভিন্ন নামে এখনও চালু আছে।

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রবক্তা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি বলেছেন, জনাব এরশাদের সমর্থন ও সহযোগিতার কারণে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল। পরে এ প্রতিষ্ঠানটি নোবেল পুরস্কার লাভ করে।

পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন। তরুণ বয়সে তিনি একজন দক্ষ খেলোয়াড় ছিলেন, পরিণত বয়সেও তিনি খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ছাত্রজীবনে বেশ কয়েকবার কারমাইকেল কলেজের ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলাধুলায় চ্যাম্পিয়ন ছিলেন।

সেনাবাহিনীর ফুটবল ও হকি টিমের খেলোয়াড় ছিলেন। সেনা ফুটবল দলেরও তিনি ছিলেন অধিনায়ক। ক্রীড়ামোদি ও ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির প্রতি ঝোঁক ছিল তার। রংপুর কারমাইকেল কলেজের বার্ষিক ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন বেশ কয়েক বছর।

তার কবিতা ও অন্যান্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে নিয়মিতভাবে জীবনের শেষ পর্যন্ত। তার লেখা কাব্য, প্রবন্ধ ও আত্মজীবনী সব মিলিয়ে ২৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। মহান সংসদেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তার লেখা একটি কবিতা তিনি পাঠ করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ভদ্র ব্যবহার, রুচিশীল, কোমল সংবেদনশীল ও রোমান্টিক মনের জন্য প্রশংসা পেয়েছেন, আলোচিত হয়েছেন।

তার জীবদ্দশায় তাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো সমীকরণ সম্ভব হতো না। ক্ষমতার লড়াইয়ে তিনি প্রায় সবসময়ই নিয়ামকের ভূমিকায় ছিলেন।

সবকিছু ছাপিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সব মানবিক গুণসংবলিত একজন নিখাদ ভদ্রলোক ছিলেন। তার অমায়িক ব্যবহার দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে মুগ্ধ করেছে। তিনি ছিলেন একজন সংবেদনশীল মানুষ।

কারও দুঃখ-কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারতেন না। মানুষের প্রতি সহমর্মিতা-ভালোবাসা, মানুষকে একান্ত আপন করে নেয়া ছিল তার চরিত্রের অন্যতম গুণ। তিনি তার কর্মে-কীর্তিতে বাংলাদেশের মানুষের মনে যেভাবে জায়গা করে নিয়েছেন, তা অমলিন থাকবে চিরকাল।

গোলাম মোহাম্মদ কাদের : জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা

G M Quader