উভয় সংকটের রাজনীতি এবং বাংলাদেশ

গোলাম মোহাম্মদ কাদের | বাংলাদেশ প্রতিদিন ।প্রকাশ : শনিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ টা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় সব দলই পরস্পরবিরোধী সমস্যার সম্মুখীন বলে মনে হচ্ছে। যেমন বলা যায়, আসন্ন সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি এককভাবে সব আসনে নির্বাচন করবে নাকি নির্বাচনী জোটের অংশ হিসেবে জোটভুক্তভাবে সীমিত আসনে প্রার্থী দেবে, তা সুস্পষ্ট নয়। কোন অবস্থান ভালো ফল দেবে এখনই তা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে না। যদিও জাতীয় পার্টি বলছে, সব গুরুত্বপূর্ণ দল নির্বাচনে ‘না এলে’ প্রথমটি, অর্থাৎ সব আসনে প্রার্থী দেওয়া হবে। আর তারা নির্বাচনে ‘এলে’ দ্বিতীয়টি অর্থাৎ সীমিত আসন নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হবে। অবশ্য প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সব উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে মোটামুটি সব দলই জোটভুক্ত হয়ে নির্বাচন করবে। ফলে সে ক্ষেত্রে বড় দলগুলোও ৩০০ আসনের সবকটিতে প্রার্থী দিতে পারবে না, কিছু আসন শরিক দলগুলোর জন্য ছাড় দিতে হবে। তবে সাধারণভাবে বড় দল বেশিসংখ্যক আসন বা এককথায় অধিকাংশ আসনে প্রার্থী দেবে। জাতীয় পার্টির জন্য দুটি বিকল্প অবস্থানের পক্ষে-বিপক্ষে পরস্পরবিরোধী যুক্তি দেওয়া সম্ভব। ফল ভালো বা খারাপ নির্ভর করবে পারিপার্শ্বিক অন্যান্য ঘটনাপ্রবাহের ওপর, যার নিয়ন্ত্রণ সর্বতোভাবে জাতীয় পার্টির আওতায় আছে বলা যায় না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনেকেই মনে করেন, একক নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ৩০০ আসনের সব স্থানেই উপযুক্ত প্রার্থী দেওয়ার সক্ষমতা নেই। নির্বাচন বর্জনকারী দল থেকে বা অন্য কোনোভাবে উপযুক্ত প্রার্থী সংগ্রহ করে তার মাধ্যমে সংগঠনের শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। এ কাজটি চলমান, তবে শেষ পর্যন্ত কোন পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে, নিশ্চিত নয়। আবার এর বিপরীতে, সীমিত আসনে প্রার্থী দিলে জাতীয় পার্টির অনেক উপযুক্ত প্রার্থী ও অনেক স্থানের শক্তিশালী সংগঠন বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরবর্তী পর্যায়ে জোট থেকে তাদের জন্য বিকল্প সুযোগ না দিলে দল শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হবে। সম্ভবত এ কারণে পরবর্তী পর্যায়ে দল দুর্বলতর হতে পারে। দরকষাকষির মাধ্যমে এ সুবিধার কতটা জাতীয় পার্টির জন্য অর্জন করা সম্ভব হবে তা এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

আবার ধরা যাক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কথা। প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির ‘নির্বাচনে আসা’ বা ‘না আসা’ কোনটি তাদের জন্য মঙ্গলজনক তা একটা সংশয়ের বিষয়। বিএনপি এলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে ও পরে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করতে পারলে সে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা অপেক্ষাকৃত ভালো হবে। তবে এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে নাকচ করা যুক্তিসংগত হবে না বলে মনে হয়। আবার বিএনপি বর্জন করলে আওয়ামী লীগের জন্য নির্বাচন বিজয় সহজ হবে। তবে সে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ঘাটতি থাকবে। পরবর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল রাজনীতি মোকাবিলা করতে হতে পারে। আন্দোলনের মাধ্যমে পতনের পরিবেশ সৃষ্টির আশঙ্কাও থাকবে।

তা ছাড়া উপরোক্ত কোন পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে নির্দিষ্ট একটি অবস্থান সামনে নিয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণ করবে ও সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেবে— তা সম্ভব হচ্ছে না আপাতত। এ ক্ষেত্রেও দলটি দোটানার মধ্যে দোল খাচ্ছে বলা যায়।

তবে সবচেয়ে বেশি দ্বিধায় দোদুল্যমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাটা তাদের দলের জন্য লাভজনক হবে নাকি বর্জন পরবর্তীতে বড় ধরনের সুফল বয়ে আনবে, এটা বড় প্রশ্ন। দুই ধরনের কার্যক্রমের পক্ষে ও বিপক্ষে যথেষ্ট যুক্তি আছে। তাদের কথাবার্তা ও কার্যক্রমে এটা বোঝা যায়, দলের নীতিনির্ধারক ও নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ প্রবল এবং দল এ প্রশ্নে বিভক্ত বলা যায়।

বিভিন্ন বক্তব্য, বিবৃতি ও আলাপ-আলোচনার সূত্র ধরে বলা যায়, দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের প্রায় সবার বিশ্বাস আগামী সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশে হবে না। নির্বাচন কমিশনসহ সাহায্যকারী সংস্থাসমূহ যেমন সংশ্লিষ্ট সরকারি আমলা, কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইত্যাদি সবাই সরকারি দল ও জোটের পক্ষে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ করবে, এটা তাদের বদ্ধমূল ধারণা। এমনকি তাদের অনেকে এও মনে করেন যে, দলমতনির্বিশেষে সব ধরনের প্রার্থীর জয়-পরাজয় সরকারি দলের নেতৃত্বের পর্যায়ে পূর্বনির্ধারিত করা হবে। সেভাবে ফলাফল ঘোষণা আসবে, এটাও হতে পারে, সে আশঙ্কা আছে তাদের অনেকের মধ্যে।

তাদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি যদি সত্যিই ঘটানো সম্ভব হয়, সে ক্ষেত্রে ওই নির্বাচনে জনসমর্থনের ঢেউ তাদের পক্ষে যতই থাকুক না কেন, বিএনপির জন্য ক্ষমতায় যাওয়ার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন অবাস্তব। তা ছাড়া সে পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সুযোগ থাকবে আপসকামী ও সুবিধাবাদী এ ধরনের বিএনপি ও জোটের প্রার্থীদের জয়যুক্ত করার, যারা পরে ব্যক্তিগত স্বার্থে আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করবেন। তারা এও মনে করেন, বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা (যেমন খালেদ জিয়া ও তারেক রহমান) এ নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পাবেন না। ফলে নেতৃত্বের ঘাটতি নিয়ে নির্বাচন-উত্তর বিএনপি খুব বেশি হলে আওয়ামী লীগ সরকারের তলপিবাহক বিরোধী দল হতে পারে। রাজনীতিতে তাদের গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাবে ও দলটি শেষতক অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।

তাদের ধারণা, আন্দোলনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করার প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। তবে সে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে তাদের ভাষায় পাতানো খেলার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোই মঙ্গলজনক হবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নির্বাচন-উত্তর সরকার দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

সে পরিস্থিতিতে জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলন ক্রমাগত বেগবান করা সম্ভব হবে ও সফলতা আসতে পারে। তারা মনে করেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনগণের চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যে ব্যবধান বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তখন তাদের ভাষায়, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দাবি আদায়ের সংগ্রামে নেমে নির্যাতিত হলেও দলের নেতা-কর্মীরা জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থনের কারণে উজ্জীবিত থাকবেন। দলের শক্তি ও গুরুত্ব দুই-ই বৃদ্ধি পাবে। পরে নিরপেক্ষ পরিবেশে নির্বাচন হলে দল জয়ী হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকবে। তবে যারা নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে তাদের যুক্তি হলো, বর্তমান সরকারি দল আওয়ামী লীগকে আর খালি মাঠে গোল দিতে দেওয়া যায় না। নির্বাচনী মাঠে উপস্থিত থাকলে, সরকারি দলের নীলনকশা (যদি থাকে) বাস্তবায়নে কার্যকর বাধা সৃষ্টি সম্ভব হবে। জনগণকে সঙ্গে রাখতে পারলে নীলনকশা ভণ্ডুল করা অসম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ভালো ফল হলেও হতে পারে।

তাদের কথা, দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। সংসদে অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। সে নির্বাচন যতই প্রশ্নবিদ্ধ মনে করা হোক, নির্বাচন-উত্তর সরকার অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে তার মেয়াদ কালের প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। তাদের মতে, সরকারি প্রশাসন ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ প্রতিপক্ষ বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের অবস্থা বর্তমানে করুণ ও মনোবল ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এবারের সংসদ নির্বাচন বর্জন ওই একই ফল বয়ে আনবে না তার নিশ্চয়তা কী? ফলে পরবর্তীতে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সক্রিয় রাখা কঠিন হতে পারে।

বরং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা উজ্জীবিত হতে পারে। তা ছাড়া নির্বাচনী মাঠে থাকলে যে কোনো কারচুপির প্রচেষ্টার বাধা দেওয়া ও ওই ধরনের কোনো উদ্যোগ জনসমক্ষে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা সহজতর হবে। তখন নির্বাচনে ভালো ফলও হতে পারে, না হলেও নির্বাচন-উত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলন অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

বিদ্যমান এ পরিস্থিতিতে আগামী দিনগুলোয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে কোন দল কী কৌশল অবলম্বন করবে তা এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শেষ পর্যন্ত দেশের পরিস্থিতি কী হতে পারে তা আঁচ করা যাচ্ছে না। এ পরিবেশ উদ্বেগজনক না হলেও অস্বস্তিকর বলা যায়। দেশবাসী এর থেকে মুক্তি চায়; কিন্তু পথ খুঁজে পাচ্ছে না।

লেখক : সাবেক মন্ত্রী ও কো-চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টি

G M Quader