জঙ্গিবাদ দমনের রাজনীতি ও বাংলাদেশ

গোলাম মোহাম্মদ কাদের
। বাংলাদেশ প্রতিদিন ।
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ টা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাস দৃশ্যমান না হলেও মানুষ স্বস্তিতে নেই বলা যায়। অনিশ্চয়তার ভয়ে মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত-অসহায়। দুর্যোগময় ভবিষ্যতের দিকে দেশ ধাবিত হচ্ছে। যে কোনো সময় বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে বেশির ভাগ মানুষের আশঙ্কা। এ ধরনের মনোভাবের যুক্তিসংগত কারণ নেই বা অমূলক বলা যাচ্ছে না। সে অর্থে দেশের রাজনীতি অস্থিতিশীল বলা যায়। রাজনীতিতে স্থিতিশীলতার অভাব অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বিভিন্নভাবে।

এ কথায় অনেকেই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। বিশেষ করে সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তা মানতে নারাজ। তাদের মতে, এক সরকার বা বাস্তবে এক সরকারপ্রধান দীর্ঘদিন ধরে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। সরকারি কর্মকাণ্ড বা কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ নেই। ফলে সরকার স্থিতিশীল ও সে কারণে রাজনীতি স্থিতিশীল।

এক সরকারপ্রধানের অধীনে দীর্ঘকাল দেশ পরিচালিত হলে, সরকার আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীল মনে হলেও তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাপকাঠি নয়। এমনকি ঘন ঘন সরকারপ্রধানের পরিবর্তন সব সময় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে না। ওই সব পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার যদি কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া না হয় তাহলে রাজনীতি স্থিতিশীল বলা যায়। অন্যদিকে দীর্ঘদিন এক সরকারপ্রধানের অধীনে থাকার পরও পরিবর্তনের সময় ও পরবর্তীতে স্বাভাবিক জীবনযাপন যদি বিঘ্নিত বা বিপদগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে সে দেশের রাজনীতি স্থিতিশীল বলা যায় না।

আমাদের মতো দেশ যা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হওয়ার কথা, সেখানে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান, জনগণের সমর্থনপুষ্ট সরকার গঠন ও জনমতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা সুষ্ঠু রাজনীতির অংশ হিসেবে বিবেচিত। এ পদ্ধতিতে শান্তিপূর্ণভাবে সরকার পরিবর্তনের ও রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপে জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। এ ধরনের সরকারের পেছনে জনসমর্থনের শক্তি ও দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতার বৈধতা থাকে। ফলে সাধারণত অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন হয় না। পরিবর্তনের পরে, কোনো অবাঞ্ছিত অবস্থা সৃষ্টির সুযোগ থাকে না।

গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে উপরোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। ভারত, যুক্তরাজ্য, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এর উদাহরণ। এসব দেশের রাজনীতি স্থিতিশীল।

সমাজতন্ত্রে বা কমিউনিজমে বিশ্বাসী দেশ যেমন চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা প্রভৃতি দেশের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের প্রচলিত রাজনীতির সঙ্গে এসব দেশের রাজনীতির মৌলিক ভিন্নতা আছে।

গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে বা অপব্যবহার করে অস্বাভাবিক পদ্ধতিতে সরকার গঠন ও পরিচালনা করা হলে সরকারের জবাবদিহিতার অভাব থাকে, সুশাসন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ থাকে না। ফলে ক্ষোভ, অসন্তোষ, হতাশা সৃষ্টি হয় ও তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের বা সরকার পরিবর্তনের সুযোগ না থাকলে হতাশা সাধারণত বিদ্বেষ, হিংসা, জিঘাংসায় রূপান্তরিত হয় ও মানুষকে সন্ত্রাসবাদের দিকে ঠেলে দেয়।

ফলে এ ধরনের সরকার যতই দীর্ঘস্থায়ী হয় ততই সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। রাজনীতির স্থিতিশীলতা ভঙ্গুর থেকে আরও বেশি ভঙ্গুর হতে থাকে, যে কোনো দিন রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটে।

আল-কায়েদা, আইএস, বোকো হারাম, তালেবানসহ ধর্মভিত্তিক ইসলামী জঙ্গি সংগঠনগুলোর উত্থান বিবেচনা করলে  দেখা যায়, যেসব মুসলিম অধ্যুষিত দেশে গণতন্ত্রচর্চার অভাব ও সুশাসনের অনুপস্থিতি, সেসব দেশে জনমনের ক্ষোভ ও হতাশার মধ্য থেকেই এর উত্পত্তি ও বিকাশ। যেমন আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, নাইজেরিয়া। এসব মুসলিম দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল না। সুশাসনের অভাব ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সংকট প্রকট ছিল। বর্তমানে ওইসব দেশ ইসলামী জঙ্গিবাদে বিপর্যস্ত।

অবশ্য কখনো কখনো এ ধরনের মতবাদও শোনা যায় যে, গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামপন্থি দল, তাদের পৃষ্ঠপোষক দল দরিদ্র ও ধর্মভীরু জনসমষ্টিকে অর্থ ও ধর্মান্ধতায় প্রভাবিত করে ক্ষমতায় আসীন হয়। পরবর্তীতে তারা জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। সেভাবেও ইসলামী জঙ্গিবাদের উত্থান সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে মিসরের সাবেক  প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি সরকার ও তার দল ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির ক্ষমতারোহণকে বোঝানো হয়। মিসরের বিখ্যাত আরব বসন্ত নামে খ্যাত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একনায়ক হোসনি মোবারক সরকারের পতন হয়। পরে ২০১২ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুরসি এবং তার দল ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টিকে জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী মুসলিম ব্রাদারহুডের ছদ্মনাম বলে বিশ্বাস করা হতো। পরে মাত্র এক বছরের মাথায় জঙ্গিবাদের সমর্থক এ অভিযোগে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট মুরসি ও তার দলকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ এলসিসি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানে মুরসি ও তার দলের নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে গ্রেফতার ও বিচারের সম্মুখীন করা হয়। সে দেশে আজ পর্যন্ত জঙ্গিবাদ নির্মূলের উদ্দেশ্যে গণতন্ত্রের চর্চা স্থগিত, মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা ব্যাপকভাবে সংকুচিত করে রাখা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে পশ্চিমা বিশ্বসহ অনেকেই বর্তমান মিসর সরকারকে সমর্থন জানিয়ে আসছে। কারণ হিসেবে জঙ্গিবাদ নির্মূল করার জন্য সাময়িকভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ছেদ টেনে শক্তিপ্রয়োগে জঙ্গিবাদ সমর্থক দল ও গোষ্ঠীগুলোকে রাজনীতি থেকে বহিষ্কার করা ছাড়া বিকল্প নেই বলে তারা বিশ্বাস করছেন। তবে, এ প্রক্রিয়ায় জঙ্গিবাদ নির্মূল সম্ভব কিনা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বরং এতে শেষ পর্যন্ত অগণতান্ত্রিক পরিবেশ ও দমন-নিপীড়নের কারণে বড় ধরনের শক্তিশালী জঙ্গি উত্থান ঘটতে পারে, সে আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

গণতন্ত্রের অভাবে জঙ্গিবাদের উত্পত্তি ও বিকাশ এ তথ্যটি মোটামুটি প্রমাণিত। তবে গণতন্ত্রায়নের সুযোগে জঙ্গিবাদের উত্থান ও বিস্তার সম্ভব এবং গণতন্ত্রচর্চায় সাময়িক ছেদ টেনে শক্তিপ্রয়োগ জঙ্গিবাদ নির্মূলে সহায়ক, এ মতবাদটি এখনো পরীক্ষাধীন বলা যায়।

দ্বিতীয় মতবাদের বিপক্ষে নিম্নোক্ত দুটি যুক্তি দেখা যায়— ১. জনগণের বিচার-বিবেচনার ক্ষমতার প্রতি অবজ্ঞা করা, যা যুক্তিসঙ্গত নয়। ২. জনগণের সম্মিলিত শক্তিকে বাইরে রেখে জঙ্গিবাদের মতো এক জটিল সমস্যাকে শুধু প্রশাসনের মাধ্যমে অস্ত্রের দ্বারা নির্মূল করা কতটুকু সম্ভব তা প্রশ্নবিদ্ধ।

হয়তো শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে স্থগিত করে শক্তিপ্রয়োগে সমাধান; অনেকটা রোগীকে ভালো করার জন্য জীবাণুযুক্ত সিরিঞ্জের সাহায্যে ওষুধ ও ময়লা বাসনপত্রে পথ্য দেওয়ার মতো হতে পারে; যা বাস্তবে রোগীকে আরও বেশি অসুস্থ করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশে যে রাজনীতি চলছে তাকে কোনোমতেই স্বাভাবিক রাজনীতি বলা যায় না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিঘ্নতা, মৌলিক অধিকার সংকোচন, বাকস্বাধীনতাসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ঘোষিত ও অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি জঙ্গিবাদের উত্থান ও বিস্তার রোধে প্রয়োজন ও যুক্তিসংগত বলে ধারণা দেওয়া হচ্ছে।

সরকার/সরকারি প্রশাসন/সরকারি দল ও জোট একদিকে, দেশের বাদবাকি আর সব মানুষ তাদের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। সে জনগণের দুঃখ আছে, বেদনা আছে, ক্ষোভ আছে, অনেক কিছু বলার আছে, কিন্তু তাদের প্রকাশ করতে বা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। জনগণই হওয়ার কথা রাষ্ট্রের সব কর্মকাণ্ডের প্রধান নিয়ামক শক্তি, জনগণ সব ক্ষমতার মালিক। সে অধিকার থেকে তারা আজ বঞ্চিত, অবহেলিত। জনগণ বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায় ও ভবিষ্যতে যে কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কায় বিমর্ষচিত্তে দিন কাটাচ্ছে।

বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ বা নেতৃত্ব দেখা যাচ্ছে না, যেখানে আশ্রয় নিয়ে সাধারণ মানুষ নিশ্চিত হতে পারে। যেসব রাজনৈতিক দল আছে, সেগুলো বর্তমানে সরকারি বিভিন্নমুখী চাপ ও বলপ্রয়োগের কারণে নিষ্পেষিত ও শক্তিহীন। এটাই বাস্তবতা। সে অর্থে দেখতে গেলে, দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে বড় ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুলের গানের নিম্নোক্ত পঙিক্তগুলো প্রাসঙ্গিক মনে হয়, ‘কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ, এ তুফান ভারী দিতে হবে পাড়ি নিতে হবে তরি পাড়’।

এ ডাকে সাড়া দিয়ে কোনো সুষ্ঠু রাজনৈতিক দল সময় থাকতে দাঁড়াতে পারলে তা ভালো। না পারলে বা তাদের দাঁড়াতে না দেওয়া হলে, সে ক্ষেত্রে মৌলবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দেবে। সমর্থন দেওয়ার বিকল্প আর কোনো স্থান/দল জনগণের সামনে থাকবে না। মৌলবাদী সন্ত্রাস নির্মূলের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ উগ্র জঙ্গিবাদ উত্থানের সহায়ক হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সময় থাকতে অর্থাৎ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটি অবাধ, সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনঃপ্রচলন আবশ্যক। পরবর্তীতে সব মহলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সংবিধানের কিছু প্রয়োজনীয় সংশোধনী করা যায়। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে গণতন্ত্রের চর্চা সুসংহত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে তা জঙ্গিবাদ দমনে সুফল বয়ে আনবে ধারণা হয়। নতুবা ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতই থেকে যাবে।

লেখক : সাবেক মন্ত্রী

G M Quader