জাপার কোনও রাজনীতি নেই

বাংলা ট্রিবিউনকে

১০:৪৮ , জুন ১৩ , ২০১৬

একই সঙ্গে সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য থেকে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করাকে দেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন জাতীয় পার্টির (জাপা) কো চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের। তিনি বলেন, তার দল জাতীয় পার্টির কয়েকজন সংসদ সদস্য সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকার কারণে তারা সংসদের ভেতরে ও বাইরে সত্যিকার অর্থে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। একইসঙ্গে দুই জায়গায় থাকার জন্য রাজনৈতিক দল হয়েও প্রকৃতপক্ষে জাপার কোনও রাজনীতি নেই। এটাকে দেশবাসীর সঙ্গে এক ধরনের প্রতরণা বলেও মনে করেন জিএম কাদের। তিনি বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে দল হিসেবে এ সময় তাদের দল অস্বিত্বের সংকটে পড়তে হতে পারে। পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদকে স্বৈরাচার বলার পেছনে কিছু যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকার কথা জানালেও দলের এই নেতা মনে করেন, এরশাদ ‍সাহেবকে স্বৈরাচার বলা বর্তমানে কিছু ব্যক্তিবর্গের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শনিবার উত্তরার নিজ বাসায় বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলা ট্রিবিউন: বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

জিএম কাদের: বর্তমান সরকার সন্তোষজনকভাবে দেশ চালাচ্ছে বলে আমি মনে করি না। আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরিস্থিতি ও সামগ্রিক অর্থনীতি জনগণের কল্যাণমুখী নয়। বেকার সমস্যা তীব্রতর হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি হয়েছে বলা হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী। জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা বিধান সরকরের প্রধানতম কাজ। সরকার অন্য অনেক কাজের মধ্যে তাদের নিরাপত্তা বিধান করা হবে এই বিশ্বাসে জনগণ সরকারকে নির্বাচিত করেন। কিন্তু বর্তমান সরকার এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে ১৬ কোটি মানুষের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে মানুষ বসবাস করে তাদের নিরাপত্তা কিভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে দেওয়া সম্ভব। ১৬ কোটি মানুষের জন্য কি ১৬ কোটি পুলিশ দিতে হবে। নাকি ৮ কোটি মানুষ পুলিশ হবে আর বাকি ৮ কোটি মানুষকে তারা পাহারা দেবে—এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা কি সম্ভব? উত্তর অতি সহজ। পৃথিবীর যেকোনও সভ্য সমাজে নিরাপত্তার জন্য একটি পরিবেশ সামাজিকভাবেই গড়ে ওঠে। এখানে নিরাপত্তার প্রশ্নে জনগণই পরস্পরকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসে। এই নিরাপত্তা বলয়ের কারণেই সার্বিকভাবে সমাজে শৃঙ্খলা বজায় থাকে। জনগণ নিরাপত্তাহানির সব কর্মকাণ্ড প্রতিহত করে। এখানে সরকার সহায়ক শক্তির ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বর্তমান সরকার পারস্পরিক সহমর্মিতার সমাজ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং বর্তমানে সরকার ও জনগণ দুটি আলাদা অস্তিত্বে পরিণত হয়ে একে অন্যের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা বলায় ভেঙে পড়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউন: সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে সাম্প্রতিক ধরপাকড় প্রসঙ্গে আপনার মত কী?

জিএম কাদের: ক্র্যাক ডাউনের নামে দিকে হাজার লোকের বেশি গ্রেফতার করা হচ্ছে। এর অধিকাংশই নিরীহ মানুষ। এতে করে জনগণের মধ্যে একটি ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। এভাবে গণগ্রেফতার জনগণের সরকারের দায়িত্ব কর্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জনগণের সরকার হলে এ ধরনের কাজ করতে পারে না। আর অতীত অভিজ্ঞতায় দেখেছি যাদের ধরা হয় তাদের নিয়ে একটি বাণিজ্য হয়। গত ক’বছর ধরে নতুন কম্পোনেন্ট ক্রসফায়ার যুক্ত হওয়ায় এই বাণিজ্য আরও প্রসারিত হয়েছে। কেউ গ্রেফতার হলে মা-বাবারা পাগল হয়ে যায় তাদের ছাড়িয়ে নিতে। বাড়ি-গাড়ি, ঘটি-বাড়ি বেছে ছেলেকে বাচানোর চেষ্টা করেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে দেখা যাবে একজন সন্ত্রাসীকে চিহ্নিত করতে সর্বোচ্চ ৩ জনকে গ্রেফতারের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু আমাদের এখানে শত মানুষ ধরেও একটা আসল দুর্বৃত্তকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমার কথা হলো গণগ্রেফতার বন্ধ করতে হবে। আর গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে যারা নিরীহ লোকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অনর্থক যাকে পায় তাকে ধরার পেছনে যারা জড়িত তাদেরও শাস্তি দিতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: জাতীয় পার্টির একইসঙ্গে সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ও বিরোধী দলের ভূমিকা পালনকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

জিএম কাদের: জাতীয় পার্টির বর্তমান অবস্থান আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমার দৃষ্টিতে আইনগতভাবে জাতীয় পার্টি এখনও সরকারের একটি অংশ। সংবিধানের ৭০ ধারা অনুযায়ী যেকোনও দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একপক্ষে থাকতে হবে। এটাই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। মন্ত্রিপরিষদে থাকা অবস্থায় সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা ওই ৭০ ধারা অনুযায়ী অসম্ভব। জাতীয় পার্টির মধ্যে যারা মন্ত্রিসভায় আছেন তারা সংসদে এ পর্যন্ত কখনোই কোনও প্রস্তাবে ‘না’ ভোট দিতে পারেনি। কেননা ‘না’ ভোট দিলে তারা সংসদ সদস্য পদ হারাবেন। কারণ তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন বলে সংসদে গন্য হয়—এটাই সংবিধানের বিধান। আর সংসদের বাইরে জাতীয় পার্টির অধিকাংশ নেতাকর্মী এবং সমর্থক সরকারবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন। তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এ ধরনের কোনও কর্মসূচি পালনের আহ্বান খুব একটা দেখা যায় না। ফলে সংসদের বাইরেও তারা বিরোধী দলের ভূমিকা তেমন একটা পালন করছে বলে মনে করি না।

জি এম কাদেরজি এম কাদের

বাংলা ট্রিবিউন: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানকে ঘন-ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে দেখা যায়। এর পেছনে কোনও কারণ বা চাপ থাকে কি না?

জিএম কাদের: সিদ্ধান্ত নেওয়া ও পরিবর্তনের পেছনে কোনও কারণ বা চাপ থাকে কিনা—এটা তিনিই সঠিকভাবে বলতে পারবেন। তবে তার ওপর  চাপ আছে এ ধরনের একটি ধারণা বহুল প্রচলিত রয়েছে। তাদের দলের মধেও অনেকে এই ধারণা পোষণ করেন। তার বিভিন্ন কথাবার্তার মাধ্যমে এ ধরনের ধারণাটি জনগণসহ বিভিন্ন মহলে সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে প্রায় ১০ বছর ধরে আপনাদের সুসম্পর্ক চলছে। তারপরও অন্যদের মতো আওয়ামী লীগও কেন আপনার পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদকে স্বৈরাচার বলে থাকেন?

জিএম কাদের: দলীয় চেয়ারম্যানকে স্বৈরাচার বলার যুক্তিসঙ্গত কিছু কারণ নিশ্চয়ই রয়েছে। এটা তো সত্য তিনি চিরাচারিত প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা আসেননি। পরে ক্ষমতার ব্যবহারের কিছু কিছু ক্ষেত্রে একনায়কসুলভ আচরণ করেছিলেন। যদিও জনগণের কাছে তার এই আচরণগুলো জনকল্যাণ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল, তবু তৎকালীন সময়ের বিরোধী দলগুলো তাকে স্বৈরাচার হিসেবেই আখ্যায়িত করে সেটাকে বহুলভাবে প্রচার করেছে। সেই কাল থেকে শুরু করে আজপর্যন্ত সরকারগুলো তার চেয়ে বেশি একনায়কসুলভ আচরণ করে আসছে। এমনকি ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রেও তারা সবসময় বৈধ বা গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি অনুসরণ করেনি। তারপরও শুধু আওয়ামী লীগ নয় তৎকালীন সব বিরোধী দলই এরশাদকে স্বৈরাচার বলে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পায়।  কিছু কিছু বুদ্ধিজীবীর ক্ষেত্রে এটা ফ্যাশন হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। এরশাদকে স্বৈরাচার বললে নিজেরা গণতন্ত্রীমনা অথবা প্রগতিশীল বলে পরিচিত হতে পারেন বলে আমার ধারণা।

বাংলা ট্রিবিউন: দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন আবার পরে যোগ দেওয়ার পেছনে কারণ কী?

জিএম কাদের: ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যেটা ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নামে পরিচিত। সেই নির্বাচনটি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আমরা বর্জন করেছিলাম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে। একইসঙ্গে একই কারণে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো জাতীয় পার্টিও বর্জন করার ঘোষণা দেয়। চেয়ারম্যানের এই আহ্বানে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে। এ জন্য বলা যায় জাতীয় পার্টির সম্পর্ক কখনও কোনও দলের সঙ্গে নয়, নীতির সঙ্গে ছিল। আর দশম সংসদ কেন বর্জন করে আবার অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, এটা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলার সময় এখনও আসেনি। দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও সচেতন সমাজ এই বিষয়টি নিশ্চয় ধারণা করতে পেরেছেন। সবাই জানতে পেরেছেন। জনগণের একটি বড় অংশও উপলব্ধি করেন। কাজেই এখন বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না।

বাংলা ট্রিবিউন: মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের বিষয়ে দলে কোনও আলোচনা রয়েছে কিনা?

জিএম কাদের: দলের যেকোনও আলোচনায় এখন মুখ্য এজেন্ড‍া হয়ে ওঠে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের বিষয়টি। দলের তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত ‍দাবি রয়েছে মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে এসে সংসদে এবং সংসদের বাইরে প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করার। এটা না করার কারণে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। দল ধীরে ধীরে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলে থাকায় রাজনৈতিক দল হলেও প্রকৃত অর্থে আমাদের কোনও রাজনীতি নেই। এটা দেশবাসীর জন্য কিছুটা হলেও প্রতারণার ‍শামিল এবং প্রকৃত জনকল্যাণমূলক রাজনীতির অংশ নয়। যে কারণে দল অস্বিত্বের সংকটে পড়তে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

G M Quader