দেশের ছাত্ররাজনীতি : অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

গোলাম মোহাম্মদ কাদের
প্রকাশ : শনিবার, ৮ এপ্রিল,  বাংলাদেশ প্রতিদিন
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল অতীত আছে। গর্ব করার মতো ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে। পাকিস্তান আমলে অর্থাৎ বাংলাদেশ যখন পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ ছিল সে সময় নির্যাতিত-নিপীড়িত গণমানুষের যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রসমাজ তাদের পাশে দাঁড়াত। সক্রিয়ভাবে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখত, জীবনের ঝুঁকি নিতেও কোনো দ্বিধা করত না। সে কারণে, শুধু ছাত্রদের মধ্যে নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল, জনপ্রিয়তা ছিল। মানুষ সব ধরনের জাতীয় সমস্যা সমাধানে ছাত্রদের প্রতি আস্থাশীল ছিল।

সে সময় ছাত্ররাজনীতির পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ ছাত্রসমাজের গণ্ডির ভিতরে সীমাবদ্ধ ছিল। ছাত্রসংগঠন বা ছাত্রনেতাদের অনেকেরই কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের নীতি, আদর্শ বা কর্মসূচির প্রতি সমর্থন বা সহানুভূতি থাকত। তারা সেসব দলের নেতাদের দিকনির্দেশনা বা উপদেশ গ্রহণ করতেন কিন্তু সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন ছাত্রদের নিজস্ব ফোরামের একচ্ছত্র কর্তৃত্বেই হতো।

তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল ছাত্রদের ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জবাবদিহিতার আওতায়। সে কারণে ছাত্ররাজনীতি ছিল ব্যক্তিগত বা দলীয় পর্যায়ে নিঃস্বার্থ। শুধু দেশ ও দেশের মানুষের পক্ষে দাবি আদায় ও তাদের বৃহত্তর স্বার্থে অন্যান্য লক্ষ্য পূরণই ছিল ছাত্ররাজনীতির উদ্দেশ্য।

জাতীয় যে কোনো ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্র সংগঠনসমূহ সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা শুধু নিয়ামক শক্তি ছিল না, পথপ্রদর্শক হিসেবেও ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলসমূহ অনুসরণ করেছে, এমনও ঘটনা ঘটেছে, ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। ষাটের দশকে তৎকালীন সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের দোসর মোনায়েম খান এ দেশে ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন বা এনএসএফ নামে একটি ছাত্র সংগঠন সৃষ্টি করেছিলেন। সরকারি অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত হয়ে তারা সরকারের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতো। জনগণের দাবি আদায়ের সংগ্রামের প্রতিপক্ষ হিসেবেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এদের ব্যবহার করা হতো। এ ছাড়া এর নেতৃত্ব ও সদস্যরা ব্যক্তিগত ক্ষমতার দম্ভে ও ব্যক্তিস্বার্থে, সরকারি প্রশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় ও মদদে, সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হতো। সাধারণ ছাত্রসমাজ তাদের কোনো দিন মেনে নেয়নি। দেশের জনগণ তাদের কখনই আস্থায় নিতে পারেনি। ফলে তারা ছাত্রসমাজ ও সার্বিকভাবে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। মহান মুক্তিসংগ্রামের সূচনাতেই এদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে পড়ে।

স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সৃষ্টির পর শুরু হলো ছাত্ররাজনীতির ক্রম অধঃপতন। প্রায় রাতারাতি স্বাধীনতা-উত্তর সরকারি দলের ভাব আদর্শ অনুসরণকারী ছাত্র সংগঠন চরিত্র ও কার্যকলাপে স্বাধীনতাপূর্ব, পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক জান্তা সৃষ্ট ছাত্র সংগঠনের মতো হতে দেখা গেল। পরবর্তী সরকারি দলসমূহের ক্ষেত্রে এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকল। অর্থাৎ সরকারি দলগুলো নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার স্বার্থে ও নেতা-কর্মীরা অবৈধ এবং অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা লাভ ও দুর্নীতির বিস্তারে সহায়তাকারী শক্তি হিসেবে, ছাত্র সংগঠনের নামে সরকারি খরচে ও মদদে পেটোয়া বাহিনী সৃষ্টি করা শুরু করল। দেখা গেল এদের নেতা-কর্মীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অছাত্র, মেধা বা দেশপ্রেমের পরিবর্তে পেশি ও অস্ত্রশক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হলো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এরা জনগণের প্রতিপক্ষ ও সাধারণ মানুষের চোখে দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী ও নিপীড়নকারী হিসেবে বিবেচিত হতে লাগল। পরিতাপের বিষয় হলো, সরকারের বাইরে অবস্থানকারী রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অবস্থার উন্নয়নে ছাত্ররাজনীতির এ অধঃপতন ঠেকানো ও আগের মতো জনকল্যাণমূলক অবস্থানে নেওয়ার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং খারাপকে খারাপ দিয়ে মোকাবিলা করার কৌশল হিসেবে নিজেরাও অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাসহ পেশি ও অস্ত্রশক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে ছাত্র সংগঠনের নামে নিজেদের পেটোয়া বাহিনী সৃষ্টি শুরু করল। ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্রদের প্রাধান্য থাকল না, ছাত্রদের স্বার্থ সংরক্ষণ থাকল না, জীবন বাজি রেখে নির্যাতিত মানুষের অধিকার আদায়ে বা রক্ষায় কোনো ভূমিকা থাকল না। বরং ছাত্ররাজনীতি জনজীবনের সংকট, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও নিরাপত্তাহীনতার অন্য নাম হিসেবে প্রতিদিন বেশি বেশি করে পরিচিত হতে থাকল। তাদের প্রধান কাজ হলো প্রতিপক্ষকে শক্তির ভাষায় দমিয়ে রাখা। সেই প্রতিপক্ষ প্রধানত অন্য রাজনৈতিক দল হলেও এর বাইরেও নিজ দলীয় নেতাদের একজনের হয়ে আর একজনকে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে চাপে রেখে, বিপদে ফেলে, ক্ষতিগ্রস্ত করে ফায়দা লোটা। তা ছাড়া সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনকে অবৈধভাবে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জমি দখল ইত্যাদি নানা জনদুর্ভোগ ও দুর্নীতির সঙ্গে ক্রমান্বয়ে বেশি করে জড়িত হতে দেখা গেল। অবশ্য জাতীয় পার্টির শাসনামলে একপর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে লেজুড়বৃত্তিকারী দলীয় ছাত্র সংগঠন বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ সব রাজনৈতিক দলকে তাদের দলীয় ছাত্র সংগঠন বিলুপ্ত করার আহ্বান জানান। এ বিষয়ে ব্যক্তিগত বিশ্বস্ততার প্রমাণস্বরূপ নিজের দল জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন ‘নতুন বাংলা ছাত্রসমাজ’ একতরফাভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

যতটুকু জানা যায়, প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা ও ছত্রচ্ছায়ায়, ব্যক্তিগত ও দলগত অবৈধ ও অনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে পরিচালিত পেশিশক্তিভিত্তিক ছাত্র সংগঠনগুলোকে বন্ধ করতে। এ প্রক্রিয়ায় ছাত্ররাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ছাত্রসমাজের হাতে ফিরে আসত। এতে আগের মতো শুধু ছাত্ররাই নয়, দেশ ও জাতিও এর সুফল পেত।

তৎকালীন বিরোধী দলসমূহ সম্মিলিতভাবে এ উদ্যোগের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। তারা এ প্রচেষ্টাকে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের ষড়যন্ত্র বলে ধারণা করে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ছাত্ররাজনীতি বলতে তারা সে সময় যা বোঝাতে চেয়েছিল তা হলো, গৌরবময় ঐতিহ্যের অধিকারী পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের গণমুখী ছাত্ররাজনীতি। কিন্তু ততদিনে সেই রাজনীতিতে পচন ধরেছিল। দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থের কালিমায়, অছাত্র ও দলীয়ভাবে পরিচালিত ছাত্ররাজনীতি কলুষিত হতে শুরু করেছিল। ফলে তৎকালীন ছাত্ররাজনীতি নিয়ে গর্ব করার মতো তেমন কিছুই তখন অবশিষ্ট ছিল না। বরং এ উদ্যোগটি সফল হলে প্রকৃত ও জনকল্যাণমুখী ছাত্ররাজনীতি পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পেত।

যা হোক, ছাত্ররাজনীতির অধঃপতন রোধের প্রাথমিক উদ্যোগ তখন সম্ভব হয়নি। বরং একতরফাভাবে হঠাৎ করে জাতীয় পার্টির তখনকার ছাত্র সংগঠন বিলুপ্ত হওয়ায় সাংগঠনিক কাঠামোয় শূন্যতার সৃষ্টি হয় ও দল সাংগঠনিকভাবে যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়ে। সংগঠনের পেশিশক্তির ঘাটতির সুযোগ বিরোধী পক্ষ ষোলআনা গ্রহণ করে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তৎকালীন বিরোধী দলসমূহের ছাত্র সংগঠনগুলো কার্যকর মারমুখী ভূমিকা পালন করেছিল। বিষয়টা ফাঁকা মাঠে দাপটে খেলে বড় জয় নেওয়ার মতো। কেননা পেশিশক্তিসংবলিত ছাত্র সংগঠনের অভাবে জাতীয় পার্টির তরফ থেকে এর বিরুদ্ধে সমানতালে অবস্থান নেওয়ার মতো যথেষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো বিদ্যমান ছিল না। তৎকালীন এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সফলতার একটি প্রধান কারণ জাতীয় পার্টির অধীন ছাত্র সংগঠনের একক বিলুপ্তি বলে এখনো অনেক বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন।

বিভিন্ন আঙ্গিক বিবেচনায় বলা যায়, দলীয় ছাত্র সংগঠন বিলুপ্তির সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল। বাস্তবায়নের জন্য তাড়াহুড়া না করে, সব রাজনৈতিক দলকে আস্থায় নিয়ে তাদের সম্মতিতে সম্মিলিতভাবে করতে পারলে হয়তো প্রয়াসটি ফলপ্রসূ হতো। যা হোক, উদ্যোগটি ব্যর্থ হওয়ায় ও উদ্ভূত নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে তৎকালীন বিরোধী দলসমূহ ক্ষমতায় আসার পরও দলীয় ছাত্ররাজনীতির পচন ধরা অপসংস্কৃতির রোধের ব্যবস্থা না করে বরং উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ঘটিয়ে চলেছে।

এর সমাধান ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার মধ্যে নয়। বরং ছাত্ররাজনীতিকে পেশিশক্তিনির্ভর অছাত্র নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দলের দলীয় কাঠামোর গণ্ডিতে আবদ্ধ ও দলীয় উদ্যোগে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত পর্যায় থেকে মুক্ত করতে হবে। অছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত ও তাদের স্বার্থে ব্যবহৃত, গণকল্যাণ পরিপন্থী ‘তথাকথিত ছাত্ররাজনীতিকে’ প্রকৃত প্রস্তাবে ছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত তাদের স্বার্থে ব্যবহৃত গণকল্যাণমুখী ‘ছাত্ররাজনীতিতে’ উন্নীত করতে হবে। আগেই বলা হয়েছে, এ ধরনের ছাত্ররাজনীতি নতুন কিছু নয়, আমাদের দেশের মানুষ অতীতে এ ধরনের ছাত্ররাজনীতি প্রত্যক্ষ করেছে। এখনো কিছু কিছু ছাত্র সংগঠন এ ধরনের ছাত্ররাজনীতি চর্চার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বর্তমানে প্রচলিত দলীয় রাজনীতির চাপে এ ধরনের প্রচেষ্টা ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে।

সমাধানের পথ নিম্নরূপ হতে পারে : সব রাজনৈতিক দল সরাসরিভাবে তাদের কোনো ছাত্র সংগঠন রাখবে না, এ বিষয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। তারা যুবক, যুব মহিলা, স্বেচ্ছাসেবক ইত্যাদি অঙ্গসংগঠনে তরুণ/যুবকদের স্থান দিতে পারে, যারা ভবিষ্যতে নেতৃত্বের জন্য এসব সংগঠন থেকে রাজনীতি চর্চার প্রস্তুতি নিতে পারেন।

বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুলসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত ছাত্রসংসদ থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধিরা সাধারণ ছাত্রদের মতামতের ভিত্তিতে কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেবেন। এভাবেই তাদের দায়িত্বশীল ও গণকল্যাণমুখী নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা ও মানসিকতা গড়ে উঠবে।

ছাত্ররা দেশের ভবিষ্যৎ। সামনের দিনে দেশ কেমন হবে তার অনেকটাই নির্ভর করছে তাদের ওপর। তারা যেন সঠিকভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে, সেই দায়িত্ব আমাদের সবার। তথাকথিত ছাত্ররাজনীতির নামে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির চর্চা ও সে প্রক্রিয়ার সংকীর্ণ দলীয় বা ব্যক্তিস্বার্থে তাদের বা তাদের নাম ব্যবহার দেশ, জাতি বা রাজনৈতিক দল কারও জন্য শেষ পর্যন্ত মঙ্গলজনক হবে না। ফলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ‘ছাত্ররাজনীতিকে’ দলীয় শৃঙ্খলমুক্ত করে, ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনায় সমর্পণ করা বাঞ্ছনীয়।
লেখক : সাবেক মন্ত্রী ও কো-চেয়ারম্যান : জাতীয় পার্টি।

G M Quader