বিমান ব্যর্থ সংস্থা, দরকার সার্জিক্যাল অপারেশন

প্রকাশ : শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২ ডিসেম্বর, ২০১৬ ২৩:৩৫

। বাংলাদেশ প্রতিদিন ।

সাবেক বিমানমন্ত্রী জি এম কাদের বলেছেন, বিমান এখন রাষ্ট্রের একটা ব্যর্থ সংস্থা। এর বড় সার্জিক্যাল অপারেশন প্রয়োজন। এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসে গেছে। নইলে রাষ্ট্রীয় এই আকাশ পরিবহন সংস্থাটিকে রক্ষা করার আর সময় পাওয়া যাবে না। যত দিন যাচ্ছে, এর অবস্থা ততই খারাপ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের যান্ত্রিক ত্রুটি প্রমাণ করে, বিমান পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের প্রথম বিমানমন্ত্রী ও বর্তমানে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস নিয়ে মূল্যায়ন করলেন ঠিক এভাবেই। সাবেক এই মন্ত্রী নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে খোলামেলাভাবেই বললেন বিমানের ভিতর-বাইরের নানা অসঙ্গতির কথা। বলেছেন, বিমান রক্ষায় করণীয় সম্পর্কেও। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বিমানে এখন আর কোনো চেইন অব কমান্ড নেই। নেই জবাবদিহিতা। যাচ্ছেতাইভাবে বিমান চালানো হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের কোনো সিদ্ধান্তকে কেয়ার করে না বিমান পর্ষদ। আমি শুনেছি, তাদের স্বেচ্ছাচারিতা এখন চরম পর্যায়ে। বিমানের প্রতিটি স্তরেই একই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারেনি বিমান। উপরের স্তরে জবাবদিহিতা না থাকায় একইভাবে নিচের স্তরেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্লাইটের নাটবোল্ট যার দেখার দায়িত্ব, সেই টেকনিশিয়ানেরও কোনো জবাবদিহিতা নেই। সবাই চলছে নিজের মতো করে।’ তিনি বলেন, ‘আমি মন্ত্রী থাকা অবস্থায় জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে এসব বিষয় দূর করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেটি আর পেরে উঠিনি। তবে এখনো এটিকে রক্ষা করা সম্ভব। এমন সৎ মানুষ বিমানে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করতে হলে সরকারের কাছে এর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সে জন্য আইনি কাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা দরকার। এটিকে পুরোপুরি কোম্পানিতে রূপ দিতে হবে, নইলে আবারও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে। অর্ধেক সংস্কার করে এর উন্নতি করা সম্ভব নয়। মন্ত্রণালয়কে হায়ারিং অ্যান্ড ফায়ারিং-এর ক্ষমতা দিতে হবে। দুর্নীতি বাড়বে, কমবে না।’ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জি এম কাদের। কিন্তু জাতীয় পার্টির এই নেতা মন্ত্রিত্ব পেলেও পাননি কর্তৃত্ব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালে বাংলাদেশ বিমান করপোরেশনকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি করা হয়। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি করার বিলটি পাস হয়। বিলে বিমান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় বিমান পরিচালনা পর্ষদের হাতে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিচালনা পর্ষদের  চেয়ারম্যানসহ সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়। বিমানমন্ত্রী জানতেই পারেন না কারা বিমানের পরিচালক হচ্ছেন। এই সুযোগে মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটিয়ে সব ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে থাকে বিমান পর্ষদ। পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ, হায়ার অ্যান্ড ফায়ারের ক্ষমতা নিয়ে মন্ত্রী আর চেয়ারম্যানের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ পায়। মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দুজনই প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুজনের ব্যাপারে নালিশও করেছিলেন। বিমানমন্ত্রীর পদত্যাগের গুজবও তখন রটে যায়। বিমানমন্ত্রী বিভিন্ন অসঙ্গতি বন্ধ করতে নানা পদক্ষেপ নিতে গিয়ে সবার শত্রুতে পরিণত হতে থাকেন। চারপাশ থেকেই তিনি চাপের মধ্যে পড়েন। পরে সরকার প্রধানের কাছে ‘হায়ারিং অ্যান্ড ফায়ারিং’-এর কর্তৃত্ব চেয়ে মন্ত্রী একটি চিঠি পাঠান। কিন্তু মন্ত্রী কিছুই করতে পারেননি। তার কোনো নির্দেশনাও মানেনি। মন্ত্রীকেই মন্ত্রণালয় থেকে সরে পড়তে হয়। জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, বিমান  কোম্পানি করার পর মন্ত্রীর হাত থেকে ‘হায়ারিং অ্যান্ড ফায়ারিং’-এর কর্তৃত্ব চলে যায়। অথচ সংসদসহ জবাবদিহিতার সবক্ষেত্রে বিমান বিষয়ে জবাব দিতে হয় বিমানমন্ত্রীকে। এমনকি বিমান কেন লোকসান দিল,  লোকসান থেকে লাভের পথে উত্তরণের জন্য কী কৌশল  নেওয়া হয়েছে তাও বিমানমন্ত্রীকে সংসদে জানাতে হয়। কিন্তু বিমানমন্ত্রীর সুযোগ নেই বিষয়গুলো জানার। জানতে  গেলে তাকে অযাচিত হিসেবে গণ্য করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এ সুযোগে বিমানে নিয়োগ, টেন্ডার,  কেনাকাটাসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্বেচ্ছাচারিতা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। জি এম কাদের বলেন, বাংলাদেশ বিমানের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করতে হলে  সরকারের কাছে এর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সে জন্য আইনি কাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা দরকার। জি এম কাদের বলেন, বিমান স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এর পরিচালনা পর্ষদকে ভাবতে হবে বিমান  দেশের জনগণের সম্পদ। এখানে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা চলতে পারে না। তিনি বলেন, ‘আমার সময়েও বিমানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ছিল। আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে এসব বিষয়ে আমরা কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারিনি।’ সাবেক বিমানমন্ত্রী বলেন, ‘বিমান কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়ের কথা আমলে কখনো নেয় না। আমার আমলেও এ ধরনের বহু ঘটনা ঘটেছে। আমি চেষ্টা করেছি কিছু করার, কিন্তু পারিনি। তিনি বলেন, বিমানে বিদেশি এমডি আনা হয়েছে। পরিবর্তন করেছে। কিন্তু বিমানের কোনো উন্নতি হয়নি। মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হয়েছে। তাতেও  কোনো উন্নতি হয়নি। পর্ষদকে লাগামহীন করে দেওয়া হয়েছে। সাবেক বিমানমন্ত্রী আরও বলেন, দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, যারা মোটা অঙ্কের টাকার বেনিফিট নিয়ে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে চাকরি ছেড়েছেন, তারা আবারও বিমানে যোগদান করেছেন। আদালতের একটি রায় নিয়ে তারা যোগদান করেন। আমি তখন বার বার বলেছি, এটা ঠিক হবে না। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের টাকায় এই গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের প্রকল্পটি করা হয়েছে। তারা বিষয়টি জানতে পারলে পরবর্তীতে বাংলাদেশের জন্য খারাপ হতে পারে। বিমানের পক্ষ থেকে আদালতে যেভাবে উপস্থাপন করা দরকার, সেভাবে করা হয়নি। সাবেক মন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি বন্ধ করতে আমি রাত-দিন কাজ করে গেছি। বিমানবন্দরের সামনের ৪৫ হাজার কোটি টাকার ৪৩৪ বিঘা জমির লিজ নিয়ে বিরাট দুর্নীতির প্রমাণ পেলাম। তখনই আমি ভেটো দিলাম। বললাম, সরকারি জায়গা, সরকারের থাকবে। এ নিয়ে আমাকে বিভিন্নভাবে কনভিন্স করার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু আমি স্পষ্ট করে বলেছি, আমাকে বা আমার সরকারকে পারচেজ করা যাবে না। প্রয়োজনে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেব, কোনো অনিয়মকে আনচ্যালেঞ্জড ছেড়ে দেব না।

G M Quader